পরীর দেশে আয়না


 রাতের আকাশে তখন আধো আলো। পূর্ণিমার আগের দিন হওয়ায় চাঁদ যেন একটু লাজুক হয়ে থমকে আছে। জোছনার নরম আলো পড়ছে শান্তিপুর গ্রামের উপর। এমন সময় গ্রামের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট কুঁড়েঘরটার দাওয়ায় বসে আছে একটি মেয়ে—তার নাম আইনা। বয়স মাত্র বারো, কিন্তু চোখ দুটো আশ্চর্য রকম গভীর। তার চোখে সবসময়ই লুকিয়ে থাকে অজানা এক কৌতূহল।


আইনার বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। একদিন বনে কাঠ কাটতে গিয়ে ঝড়ের মধ্যে গাছ ভেঙে পড়ে তার মৃত্যু হয়। এরপর থেকে আইনা আর তার মা জাহেদা একে অপরের উপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে। মা গ্রামের বাড়িতে কাজ করে যা আয় করতো, তা দিয়েই তাদের কোনো রকমে সংসার চলে। কিন্তু তারপরও এই ছোট্ট মেয়েটার মুখে কখনো হতাশা ছিল না। সে বিশ্বাস করতো—এই পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও তার জন্য একটি আশ্চর্য জগৎ অপেক্ষা করছে।


দিনের বেলা কাজ সেরে মা যখন ঘুমাতো, আইনা তখন দৌড়ে চলে যেতো বনের দিকে। বনের মধ্যেই তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা—একটা পুরনো বটগাছ। গাছের নিচে বসে সে ঘাস ছুঁয়ে গল্প বানাতো, পাখিদের সাথে কথা বলত, আর আকাশ শক্ত তাকিয়ে স্বপ্ন দেখত।

কিন্তু আজ বটগাছের সামনে দাঁড়াতেই সে ভ্রু কুঁচকে গেল। গাছের গায়ে হালকা নীল আলো জ্বলছে—আগে এমন কখনো দেখেনি। সে একটু ভয় পেলেও কৌতূহল তাকে আরও কাছে টেনে নিল। হাত বাড়াতেই—

গাছের গায়ে একটি গোলাকার দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল!


ভয় আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আইনা দরজার ভিতরে উঁকি দিল। ভিতরে ঝলমলে আলো, যেন হাজারো জোনাকি মিলে একটি আলোর নদী বানিয়েছে।

হঠাৎ সে একটি মিষ্টি কণ্ঠ শুনল—

“ভয় পেও না আইনা। তোমাকে অপেক্ষা করছিলাম।”


চমকে উঠে পিছিয়ে গেল। কিন্তু আলো থেকে ধীরে ধীরে ভেসে এলো একটি ছোট্ট উজ্জ্বল অবয়ব—একটি পরী।

পরীর ডানা দুটো নীল-সাদা রঙের, যেন বরফের মতো স্বচ্ছ। চোখ দুটো গাঢ় সবুজ।

পরী বলল,

“আমি আলোর পরী—লাবণ্য। বটগাছটি আমাদের জগতের দরজা। আর তুমি আজ প্রথমবারের মতো আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছ।”


আইনা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।

—“আমার ডাক?”

পরী মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ। পরীর দেশে একদিন একটি ভবিষ্যদ্বাণী বলা হয়েছিল—একটি মানব শিশু পরীদের অন্ধকার মুক্ত করবে। সেই শিশুটি তুমি।”


আইনা বিশ্বাস করতে পারছিল না।

—“কিন্তু আমি তো সাধারণ মেয়ে। আমি কীভাবে মুক্তি দেব?”

পরী হাসলো,

“তোমার হৃদয়ই সবকিছু। কিন্তু চল—তুমি নিজেই সব দেখবে।”


এবার পরী হাতে হাত রাখতেই আইনা হালকা ঝাঁকুনি অনুভব করলো। চোখের সামনে সবকিছু ঘুরতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে পৌঁছালো এক বিশাল আলোকিত দুনিয়ায়—পরীর দেশ।


এখানে আকাশ নীল নয়, বরং বেগুনি। মেঘগুলো গোলাপী। গাছগুলোতে সোনালি পাতা। নদীর পানি আলো ছড়ায়। পাখিরা গেয়ে ওঠে সুরেলা ভাষায়। পুরো দেশটা যেন এক অবিশ্বাস্য স্বপ্ন।

আইনা অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।


পরী বলল,

“এই দেশ একসময় সুখে ভরা ছিল। কিন্তু আমাদের রাণী, রূপসা-রানী, অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার হৃদয়ের আলো নিভে যাচ্ছে। আর তার আলোর সঙ্গে সাথে পুরো পরীদেশ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।”


আইনা অবাক হয়ে বলল,

—“আর আমি… আমি কী করতে পারি?”

লাবণ্য পরী বলল,

“তোমার আছে ‘মানব হৃদয়ের আলো’। সেটা যদি তুমি রাণীর কাছে পৌঁছে দিতে পারো, সে সুস্থ হবে। আর অন্ধকার দূর হবে।”


কিন্তু সমস্যা ছিল—রাণীর প্রাসাদে যাওয়ার পথ রক্ষা করছে এক ভয়ঙ্কর ছায়া দানব। সে আলো সহ্য করতে পারে না এবং রাণী অসুস্থ হবার পর থেকেই পুরো পথ দখল করে রেখেছে।


আইনা গভীর শ্বাস নিল। ভয় লাগলেও মনের মধ্যে একধরনের শক্তি অনুভব করছিল। সে বলল,

—“আমি চেষ্টা করবো। আমাকে পথ দেখাও।”


🌟 পরীর দেশে যাত্রা

লাবণ্য পরীর সাথে আইনা একটি সোনালি নৌকায় চড়ে বসল। আলো নদী ধরে তারা এগোতে লাগল। জোনাকিরা পথ দেখাচ্ছিল, আর বাতাসে মুগ্ধকর সুর।

কিন্তু কিছু সময় পর আকাশ কালো হতে লাগল। আলো নদীর পানি অন্ধকার হয়ে গেল।

পরী বলল,

“দানবের এলাকা শুরু হলো। সাবধান থেকো।”


হঠাৎ নৌকা কেঁপে উঠল। পানির নীচ থেকে যেন কিছু একটা নৌকাকে উলটে দিতে চাইছে। আইনা ভয় পেয়ে বলল,

—“এটা কী?”

পরী বলল,

“ছায়ার হাত। আমাদের আলো তাকে পোড়াচ্ছে, তাই সে বাধা দিচ্ছে।”


আইনা দ্রুত নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দুটো সামনে এগিয়ে দিল। তার হাতের তালু থেকে একটুকরো সাদা আলো বের হয়ে নদীর অন্ধকার অংশে পড়তেই ছায়া মিলিয়ে গেল।

পরী বিস্ময়ে বলল,

“তোমার আলো আগের চেয়েও শক্তিশালী!”


এভাবে তারা সামনে এগিয়ে গেল।


🏰 ছায়ার প্রাসাদের সামনে

একসময় তারা পৌঁছাল একটি বিশাল কালো প্রাসাদের সামনে। চারপাশে ঝড়ো বাতাস, আর কালো ধোঁয়া ঘুরছে।

পরী বলল,

“এখানেই দানব থাকছে। তাকে পরাজিত করতে হলে তোমাকে তোমার মনের আলো ব্যবহার করতে হবে।”


প্রাসাদের দরজা কাঁটাযুক্ত। ভয়ঙ্কর।

কিন্তু আইনা সাহস করে ভিতরে ঢুকল।

ভিতরটা অন্ধকার—পুরো অন্ধকার। চোখে কিছু দেখা যায় না। কিন্তু হঠাৎ গভীর গর্জন শোনা গেল।


“কে আমার এলাকায় প্রবেশ করেছে?”


আইনা কেঁপে উঠল।

অন্ধকারের ভেতর থেকে বের হয়ে এল দানব—তার শরীর সম্পূর্ণ কালো, চোখ লাল আগুনের মতো, কণ্ঠ ভীষণ ভয়ঙ্কর।


দাঁত কিড়মিড় করে সে বলল,

“মানব শিশু? তুই আলোর বাহক? আমি তোকে এখানেই গিলে ফেলবো!”


আইনা পিছিয়ে গেল। কিন্তু তখনই তার মনে বাবার কথা ভেসে উঠল—

“সাহস মানে ভয় পাওয়া নয়, ভয়কে জিততে পারা।”


সে চোখ বন্ধ করল। নিজের হৃদয়ে শান্তি খুঁজল। ভাবল—মা, তার ছোট্ট ঘর, গ্রামের ভালোবাসা, বনের পাখি—সবকিছু মিলিয়ে যে আলো সে প্রতিদিন অনুভব করত।

পরের মুহূর্তেই তার বুক থেকে এক বিশাল আলোকরশ্মি বেরিয়ে দানবের দিকে আঘাত করল।

দানব চিৎকার করে উঠল—

“আআআলো!!! না!!!”


আলো যত বাড়তে লাগল দানব তত ছোট হতে লাগল। শেষমেশ দানব ধোঁয়ার মেঘ হয়ে মিলিয়ে গেল।

পরী ছুটে এসে বলল,

“আইনা! তুমি পেরেছো! দানব শেষ!”


👑 রাণীকে উদ্ধার

তারা দৌড়ে রাণীর প্রাসাদে পৌঁছালো। সামনে বিশাল দরজা, যার উপর সোনালি চিহ্ন।

ভিতরে গিয়ে দেখে—রূপসা-রাণী একটি সিলভার বিছানায় শুয়ে আছেন। শরীর নিস্তেজ।

তার চোখ আধখোলা, ঠোঁট কাঁপছে। মনে হচ্ছে তিনি আর খুব বেশি সময় টিকতে পারবেন না।


আইনা তার পাশে গিয়ে বসলো।

পরী বলল,

“এখন তোমার হৃদয়ের আলো তাকে দাও।”


আইনা রাণীর বুকে তার দুই হাত রাখল। মন থেকে সমস্ত ভয় দূর করে ভালোবাসা আর আলো কল্পনা করল। তার হাতের নিচে ধীরে ধীরে আলো জমে উঠল।

পুরো ঘর আলোকিত হয়ে গেল।

রাণীর চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেল। মুখে হাসি ফুটে উঠল।

তিনি উঠে বসে বললেন,

“মানব শিশু… তুমি আমাদের বাঁচালে।”


রূপসা-রাণীর শরীর ঝলমল করতে লাগল। আলোর ঢেউ ছড়িয়ে পুরো দেশ আলোকিত হয়ে উঠল। গাছ, পাখি, নদী—সবকিছু আবার প্রাণ ফিরে পেল।

পরীরা উল্লাস করতে লাগল। সবার মুখে আনন্দের হাসি।


রাণী আইনার মাথায় হাত রেখে বললেন,

“তোমার হৃদয়ের আলো এই দেশের রক্ষাকবচ হয়ে থাকবে। তুমি চাইলেই আবার আমাদের দেখতে আসতে পারবে।”


আইনার চোখে পানি এসে গেল।

—“আমি কি আবার আসতে পারব?”

রাণী বললেন,

“হ্যাঁ। যতদিন তোমার হৃদয়ে ভালোবাসার আলো থাকবে, বটগাছের দরজা সবসময় তোমার জন্য খোলা থাকবে।”


🏡 ফিরে যাওয়া

লাবণ্য পরী আইনার হাত ধরল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবার সেই বটগাছের সামনে ফিরে এল।

আকাশে সূর্য উঠেছে। পৃথিবী আগের মতোই আছে।

কিন্তু আইনা জানে—আজকের দিনটি তার জীবন বদলে দিয়েছে।


সে ঘরে ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরল।

মা অবাক হয়ে বলল,

—“আইনা, আজ তোমাকে খুব খুশি লাগছে। কিছু বলবে?”

আইনা হাসল,

—“মা, আমি একদিন তোমাকে সব বলব… কিন্তু এখন শুধু এটুকু বলি… পৃথিবীতে আলো আছে। আমাদের সবার মধ্যেই আছে।”


রাত হলে সে আবার বটগাছের দিকে তাকাবে, ভাববে—

“আজ পরীরা কেমন আছে?”


আকাশে নরম বাতাস বইবে।

চাঁদের আলোয় বটগাছের গায়ে হালকা নীল ঝিলিক দেখা যাবে।

এ যেন আরেক দিনের আমন্ত্রণ। এই গল্পের লেখক ফ্রিল্যান্সার মনির হুসাইন যদি গল্পটি ভালো লাগে লাইক কমেন্ট শেয়ার করতে ভুলবেন না অবশ্যই পরবর্তী ভিডিও পেতে চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে সাথে থাকুন আল্লাহ হাফেজ 


Post a Comment

0 Comments