হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর জন্ম ও শৈশবকাল
মক্কার চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা মরুভূমি, মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কাবা শরীফ। সেই নগরীতে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, আরবদের ভাষায় “আমুল ফীল” বা হাতির বছরে, জন্ম নিলেন এমন এক শিশু যিনি ইতিহাসকে চিরদিনের জন্য বদলে দেবেন। তিনি হলেন— হযরত মুহাম্মদ ﷺ।
আমুল ফীলের বছরটি আরবদের কাছে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছে। কারণ সে বছর ইয়েমেনের রাজা আবরাহা বিশাল হাতি বাহিনী নিয়ে কাবা ধ্বংস করতে এসেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘর রক্ষা করলেন। আসমান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবীল পাখি আসল এবং ছোট ছোট পাথর ফেলে আবরাহার সৈন্যদের ধ্বংস করে দিল। সেই অলৌকিক বছরেই জন্ম নিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল।
হযরত মুহাম্মদ ﷺ রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, সোমবার সকালে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আগেই তাঁর বাবা, আব্দুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব, বাণিজ্য সফরে গিয়ে ইন্তেকাল করেন। তাই নবীজী ﷺ জন্মের পর থেকেই পিতৃহীন ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম আমিনা বিনতে ওহাব। সন্তান জন্মের মুহূর্তেই মায়ের চোখে আনন্দ আর বেদনার অশ্রু একসাথে ঝরছিল— আনন্দ এই কারণে যে আল্লাহ তাঁকে একটি পুত্রসন্তান দিয়েছেন, আবার দুঃখ এই কারণে যে সেই সন্তানের মাথার উপর বাবার ছায়া নেই।
আরব দেশে সেই সময় ধনী পরিবারগুলো শিশুদের দুধপান ও লালন-পালনের জন্য মরুভূমির সৎ-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা দাইমা বা পালক মায়ের কাছে দিত। আমিনা তাঁর নবজাতক সন্তানকেও সেই নিয়মে দুধমা হালিমা সাদিয়ার হাতে তুলে দিলেন। হালিমা বনের পরিবেশে তাঁকে লালন-পালন করলেন। নবীজী ﷺ ছোটবেলা থেকেই অন্য শিশুদের তুলনায় আলাদা ছিলেন— চুপচাপ, ভদ্র, বিনয়ী এবং সৎ। হালিমা ও তাঁর পরিবার নবীজী ﷺ-কে নিজেদের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন।
কিছু বছর পরে আমিনা তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। কিন্তু ছয় বছর বয়সে যখন তিনি মায়ের সাথে মদিনার কাছাকাছি সফরে যান, ফেরার পথে আমিনা ইন্তেকাল করেন। এভাবে মুহাম্মদ ﷺ এত অল্প বয়সেই মা-বাবা দুজনকেই হারালেন। এরপর তাঁর দায়িত্ব নিলেন দাদা, আবদুল মুত্তালিব। দাদা তাঁকে ভীষণ ভালোবাসতেন, সবসময় সাথে রাখতেন। তবে মাত্র দুই বছর পর দাদাও ইন্তেকাল করেন। তখন আট বছরের ছোট্ট অনাথ শিশুটি তাঁর চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে চলে আসেন।
শৈশব থেকেই মুহাম্মদ ﷺ-এর চরিত্র অন্য সবার কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছিল। তিনি কখনো মিথ্যা বলতেন না, কারো সঙ্গে অন্যায় করতেন না। তাই সবাই তাঁকে “আল-আমিন” বা “বিশ্বাসযোগ্য” নামে ডাকতে শুরু করল। মক্কার মানুষ তাঁর সততা ও নৈতিকতার জন্য তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করত।
মুহাম্মদ ﷺ ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করতেন। প্রথম জীবনে তিনি অন্যদের ভেড়া চরাতেন। পরে বড় হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হন। তিনি যেখানেই থাকতেন, সততা ও ন্যায়ের জন্য মানুষের আস্থা অর্জন করতেন।
নবীজীর শৈশব ও কৈশোরকাল ছিল কষ্টে ভরা। তবুও আল্লাহ তাঁকে সেই কষ্টের মধ্য দিয়ে ধৈর্য, সততা ও মানুষের প্রতি দয়া করার শিক্ষা দিলেন। তিনি ছিলেন এতিমের মমতাময় আশ্রয়, গরিবের বন্ধু, আর সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক।
এইভাবেই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে প্রস্তুত করলেন এক মহৎ দায়িত্বের জন্য— মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয়, মূর্তিপূজা থেকে এক আল্লাহর ইবাদতে আহ্বান করার জন্য।
0 Comments